
কলাম
——–
আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, দিয়েছেন জ্ঞান ও বিবেকবোধ যা অন্য প্রাণীর মধ্যে অনুপস্থিত। এখানেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ত । এখন মানুষ যদি নফসের গোলামী করে বিবেকবোধ হারায় তাহলে মানুষ আর জড় পদার্থের মাঝে পার্থক্যটা কোথায়?
কুরআনে এসেছে ‘ “তোমরা ভাল কাজের আদেশ দাও ও খারাপ কাজে নিষেধ করো।” এখন আমরা যদি শুধু ভাল কাজের আদেশ দিলাম, তাহলে ইসলাম আংশিক মানা হলো। এ প্রসংগে আল কুরআনে আল্লাহ বলেন “তোমরা কি কুরআনের কিছু অংশ মানবে আর কিছু অংশ অস্বীকার (মানবে না) করবে? যারা এমন করবে তাদের জন্য দুনিয়াতে রয়েছে লাঞ্ছনা আর আখিরাতে রয়েছে কঠোরতর আযাব।– সুরা বাকারা, ৮৫।
ধৈর্য একটি মহৎ গুণ। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” — সূরা বাক্বারা- ১৫৩। আর মু’মীনের একটি আবশ্যকীয় গুণ হলো অপরকে সবরের উপদেশ দেয়া। — সূরা আসর- ৩।
তবে এর একটা সীমা আছে। ধরুন কয়েকজন পাপিষ্ঠ একজন মেয়েকে ধর্ষন করছে। মেয়েটি চিৎকার করে আপনার সাহায্য কামনা করছে। আর আপনি বললেন, ‘সবর কর মা’। এটা একটা কাপুরুষতা। এজন্যই অসৎ কাজ বন্ধ করার ভূমিকার উপর বান্দার ঈমানের স্তর নির্ভর করে।
(১) যে হাত দিয়ে বাধা দিবে সে প্রকৃত ঈমানদার। (২) তা সম্ভব না হলে মুখ দিয়ে নিষেধ করবে। এটা মাঝারী ঈমানের স্তর। তাও না পারলে (৩) মনে মনে ঐ কাজটাকে ঘৃণা করবে এবং এ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা যে কিভাবে ঐ সমস্যা দূর করা যায়। এটা সর্বনিম্ন স্তরের ঈমান। তবে আমাদের সবর যেন কাপুরুষতায় পরিণত না হয়। তৃতীয় স্তরের চারটি প্রাক্টিক্যাল ব্যখ্যা দিতে চাই।
(ক) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া আমার এক বড় ভাই বললেন “এক মহিলা প্রতিদিন সকালে অশ্লীল পোষাকে ব্যায়াম করতে বের হন। সেই বড় ভাই ঐ মহিলার ছেলের সাথে বন্ধুত্ত করে তার বাড়ীতে যান। বড় ভাই ঐ মহিলাকে বললেন, খালাম্মা! “আপনি তো রোজ সকালে হাটতে বের হন।” মহিলা বললেন, ‘হ্যা বাবা।’ তার পর থেকে ঐ মহিলা আর খোলামেলা পোষাকে বের হননি।
(খ) আমি একদিন ঢাকা থেকে সিলেট আসার পথে গাড়ীতে রুচিহীন ছবি চলছিল। সব যাত্রী নিরব। আমি হেলপারকে বললাম, “দেখো অনেকের ঘুমের অসুবিধা হচ্ছে। তোমরা ছবি দেখ, সাউন্ড কমাও।” হেলপার সাউন্ড বন্ধ করল। এর মিনিট দশেক পর পুরা টিভি বন্ধ করল।
(গ) পাশের জেলা থেকে এক মহিলা আমাদের গ্রামে এসে পাপাচারে লিপ্ত হয়। আমি সমাজের লোকদের সাথে কথা বললাম, লাভ হয়নি। পরে আমি জেলা শহরে গিয়ে ঐ মহিলাকে ধমক দিয়ে বাম হাত দিয়ে একটি চিঠি লিখে রেজিস্ট্রি করলাম। ব্যস, পজেটিভ ফল পেলাম।
(ঘ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া আমার এক বড় ভাই বললেন “কিছু ছেলে নির্জন স্থানে গিয়ে বোতলে মদ খায়। ঐ বড় ভাইও বোতলে দুধ নিয়ে তাদের পাশে গিয়ে মদ খাওয়ার ভান করে। শুরু হয় বন্ধুত্ত। ঐ বড় ভাই তাদেরকে মদের ভয়াবহতা বুঝিয়ে সুপথে আনে।
এখন যদি ঐ বন্ধুটি তাকে সুপথে না আনত, সে মদের পর হেরোইন সেবন শুরু করতো। আর এই নেশার টাকা জোগাড় করতে বেছে নিতো ছিনতাইয়ের পথ। একদিন সে CNGতে থাকা ‘অতি পরহেজগার’ ব্যক্তির ব্রিফকেস, স্ত্রীর গহনা, ছেলের ল্যপটপ ও মেয়ের মোবাইল ছিনিয়ে নিতো, যে পরহেজগার ব্যক্তি মনে করে “বাবারে! এই ফেতনার যুগে কোনমতে ঈমান বাচায়, অন্যায় দেখে কিছু বললেই বিপদ।” আর ঐ ব্যক্তির ছেলেটি জোরাজুরি করলে একটা উইকেট পড়ার (জানের ক্ষতি) সম্ভাবনা। অর্থাৎ জান মাল উভয়ের ক্ষতি।
এখন যদি ঐ তিন ব্যক্তি শুধু খারাপ কাজকে ঘৃণা করতেন তাহলে কি ঐ সমস্যাগুলো দূর হতো? না কক্ষনো না। এজন্য দরকার হেকমত বা কৌশলী হওয়া। অনেক সময় হাত দ্বারা(১ম স্তর) ও জবান দ্বারা ( ২য় স্তর) সম্ভব না হলেও কৌশলে (৩য় স্তর) সম্ভব হয়। আমরা সাধারণত চিন্তা করি—–
* যার সন্তান সে চোখে দেখে না?
* এ কথা বললে যদি আমার চাকুরী যায়?
* আমি নিষেধ করলে যদি নিষেধ না মানে?
* আজকাল যে যুগ! কারো কিছু বলা যায় না।
* যার পাপের ফল সে-ই পাবে, তাতে আমার কি?
* কেউ কিছু বলে না। আমি নিষেধ করে তার কাছে খারাপ হতে যাব কেন?
আসলে আমরা ইসলাম ততটুকু পালন করতে চাই যতটুকু পালন করলে পরিবার, সমাজ ও দেশের পক্ষ থেকে কোন বাধা বা অভিযোগ থাকে না। মানুষকে নয়; আল্লাহকে ভয় করুন। যে আল্লাহকে ভয় করে সে কোন মাখলুককে ভয় করে না। আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে ইসলামের সঠিক বুঝ দান করুন। ফুলের মত সুন্দর হোক আমাদের জীবন। ধন্যবাদ সবাইকে।
লেখক ড. মোঃ শরিফুল ইসলাম
গবেষক ও কলামিস্ট, সিলেট।