
আট বছর পর নির্বাচনী মাঠে চা শ্রমিকরা চা বাগানে ফিরছে ভোটের উৎসব
মোঃ আমজাদ হোসেন বাচ্চু, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
(তিন বছর পরপর নির্বাচনের বিধান থাকলেও ২০২১ ও ২০২৪ সালে হয়নি; দীর্ঘদিনের ক্ষোভ-সমালোচনার পর শুরু হচ্ছে নির্বাচনী তোড়জোড়)

দীর্ঘ সাড়ে আট বছর পর আবারও নির্বাচনের পথে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন। আগামী ২৮ নভেম্বর দেশের চা বাগানগুলোতে একযোগে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পাশাপাশি বিভিন্ন স্তরের পরিষদের জন্য প্রতীক নির্ধারণ করেছে বাছাই নির্বাচন কমিশন। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়ায় ইউনিয়নের নেতৃত্ব, প্রতিনিধিত্ব ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে চা শ্রমিকদের মধ্যে যে আলোচনা-সমালোচনা ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, নতুন তফসিল ঘোষণায় তা আবারও সামনে এসেছে।
সর্বশেষ ২০১৮ সালের ২৪ জুন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ইউনিয়নের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর নির্বাচন হওয়ার কথা। সে হিসাবে ২০২১ সালে পরবর্তী নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও তা অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০২৪ সালেও নির্বাচন হয়নি। ফলে তিন বছর মেয়াদের নির্বাচিত কমিটি প্রায় সাড়ে আট বছর ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছে।
দীর্ঘ সময় নির্বাচন না হওয়ায় শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব, নেতৃত্বের জবাবদিহি এবং ইউনিয়নের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। শ্রমিকদের একাংশের অভিযোগ, নির্বাচিত নেতৃত্ব না থাকায় তাঁদের দৈনন্দিন সমস্যা, মজুরি, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য অধিকার আদায়ের দাবিগুলো যথাযথভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ইউনিয়নের দায়িত্বশীল নেতারা নির্বাচন বিলম্বের পেছনে আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতাসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কথা বলে আসছেন।
২০২৬ সালের ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দ্য ডেইলি স্টারও আট বছর ধরে নির্বাচন না হওয়া এবং এর ফলে চা শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বের সংকট, নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও শ্রমিকদের অসন্তোষের বিষয়টি তুলে ধরে। প্রতিবেদনে ইউনিয়নের নেতাদের বক্তব্যে নির্বাচন বিলম্বের প্রশাসনিক ও আর্থিক জটিলতার কথাও উঠে আসে।
এবার ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৫ নভেম্বর মনোনয়নপত্র বিতরণ, ৯ নভেম্বর জমা, ১০ নভেম্বর যাচাই-বাছাই এবং ১৩ নভেম্বর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৪ নভেম্বর প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ করা হবে। এরপর ২৮ নভেম্বর সকাল থেকে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বাছাই নির্বাচন কমিশন-২০২৬-এর প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুছ সামাদ আল আজাদ স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় বিভিন্ন স্তরের পরিষদের জন্য প্রতীক নির্ধারণ করা হয়।
নির্দেশনা অনুযায়ী, পঞ্চায়েত কমিটির প্রাথমিক কার্যকরী পরিষদের জন্য ১০টি প্রতীক নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হলো—ঘোড়া, উড়োজাহাজ, টেলাপাখি, টিউবওয়েল, চিংড়ি, মাইক, চিরুনি, ময়ূর, ঘণ্টা ও আলমারি।
ভ্যালি কার্যকরী পরিষদের জন্য নির্ধারিত ছয়টি প্রতীক হলো—আম, সেলাই মেশিন, টেলিফোন, টর্চলাইট, টেবিল ও তালা-চাবি।
কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সভাপতি মণ্ডলীর জন্য ছয়টি প্রতীক রাখা হয়েছে। এগুলো হলো—আনারস, জাহাজ, কলস, কাপ-পিরিচ, বই ও রেলগাড়ি। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সম্পাদক মণ্ডলীর জন্য নির্ধারিত প্রতীকগুলো হলো—মোরগ, ফুটবল, টেবিল, হরিণ, ঘুড়ি ও পানির ট্যাপ।
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পঞ্চায়েত কমিটির প্রাথমিক কার্যকরী পরিষদ, ভ্যালি কার্যকরী পরিষদ এবং কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের মনোনয়নপত্র প্যানেলভিত্তিকভাবে নির্ধারিত পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছ থেকে সংগ্রহ ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা দিতে হবে। নির্ধারিত প্যানেলের বাইরে কোনো প্রার্থীর মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা হবে না।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক কাঠামো তিন স্তরবিশিষ্ট। এগুলো হলো বাগান পর্যায়ের পঞ্চায়েত কমিটি, ভ্যালি কার্যকরী পরিষদ এবং কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ। ইউনিয়নের সাতটি ভ্যালি হলো—লস্করপুর, বালিশিরা, মনু-ধলাই, লংলা, জুড়ী, সিলেট ও চট্টগ্রাম।
ঘোষিত নির্বাচনী সূচি অনুযায়ী, দেশের ২৩১টি চা বাগান ও ফাঁড়ি বাগানের প্রায় ৯৮ হাজার ৭৫২ জন চা শ্রমিকের ভোটাধিকার প্রয়োগের কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট চা বাগানের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিনের বিরতির পর এই নির্বাচনকে ঘিরে চা বাগানগুলোতে নতুন করে নির্বাচনী আলোচনা শুরু হয়েছে। শ্রমিকদের প্রত্যাশা, এবার একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে তাঁদের পছন্দের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে নির্বাচিত নেতৃত্ব শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, মজুরি, আবাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য অধিকার আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
এদিকে নির্বাচনী তফসিলের কোনো অনুচ্ছেদের পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন ও সংশোধনের ক্ষমতা প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংরক্ষণ করেছেন বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচনসংক্রান্ত বিধিমালা, আইন ও তফসিল শ্রম অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট www.dol.gov.bd থেকে সংগ্রহ করা যাবে।
এবিষয়ে চা শ্রমিক ইউনিয়নের বিলুপ্ত কমিটির সহসভাপতি পঙ্কজ কুন্ড বলেন ‘নানা প্রতিকুলতা পেড়িয়ে সাড়ে বছর পর চা শ্রমিক ইউনিয়ন এর নির্বাচন হতে চলেছে- গত কাল খবরটা জানতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত।’ এজন্য তিনি নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘এখন আমারদের একটাই প্রত্যাশা কাঙ্ক্ষিত এই নির্বাচন যেন অবাধ ও সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন হয়। একজন চা শ্রমিক নেতা হিসেবে আমি আশা করি সাধারণ শ্রমিকদের ভোটে একটি শক্তিশালী ও শ্রমিকবান্ধব নেতৃত্ব উঠে আসবে।’